তাঁর কাছে কোন কিছুই ব্রাত্য ছিল না, ডাঃ রেজাউল করিমের কলম

ডাঃ রেজাউল করিম

আজ বাইশে শ্রাবণ। মুক্ত চিন্তার দূতের নবকলেবর গ্রহণ করার দিন। আজ বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করতে চাই। তাঁর পথকেই নিজের পথ ভেবে চলার চেষ্টা করি, সেই প্রচেষ্টায় যেন সাফল্য অর্জন করি।
তাঁর কাছে কোন কিছু ব্রাত্য ছিল না, যা সচল, সজীব, যা প্রাণে আনে নবযৌবনের জোয়ার তাই তিনি গ্রহণ করেছেন অক্লেশে। দেশে যখন মুক্ত চিন্তার মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমছে, ক্ষমতাসীন দলের কথা বেদবাক্যের মত গ্রহণ করছে বিদ্বজ্জন, তখন তাঁর কথা বেশি করে মনে পড়ে। তিনি ব্রিটিশ রাজশক্তির দাসত্ব করতে অস্বীকার করে তাঁদের দেওয়া উপাধি বর্জন করেছেন। যখনই মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর তৈরী হয়েছে, তাঁর কলম ঝলসে উঠেছে, কুৎসিত, বিভৎসা পরে তাঁর তীব্র ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছে। ধর্মের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে মানবতায় উত্তরণের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।

আরও পড়ুন-CBI জানালো, উন্নাও ধর্ষণকাণ্ডে বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার দোষী

তিনি “রামায়ণী কথা”র প্রারম্ভিক আলোচনার লিখেছিলেন, ইয়োরোপীয়রা রামায়ণ কে এপিক বলে বর্ণনা করেছেন, তার আগে রামায়ণ মহাভারতকে আমরা ইতিহাস বলে জানতাম। সাল তামামির ইতিহাস নয়, এই দেশের আবহমান কালের সংস্কৃতির ইতিহাস। রামের চরিত্র উচ্চ বা নীচ, লক্ষণকে আমার ভাল লাখে কি লাগে না, সেটা বিবেচ্য নয়। রাজা হিসেবে কতটা ভাল ছিলেন তার চেয়ে ও গুরুত্বপূর্ণ ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের প্রেম, পিতার জন্য সন্তানের আত্মত্যাগ। বস্তুতঃ রামায়ণ ঘরের কথাকেই বড় করে দেখিয়েছে। রামায়ণ কোন আদর্শ কে বড় করে দেখিয়েছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রামের নামে জয়ধ্বনি করে মানুষ খুন রামায়ণের ঐতিহ্য নয়। কিন্তু, আমি যত বড় সমালোচক হই না কেন, একটি সমগ্র জাতির আবহমানের সংস্কৃতি যার সাথে মিশে আছে, তাকে নতমস্তকে স্বীকার করে নিতেই হবে। সেই মূল সুরকে অক্ষুন্ন রেখে তাকে আধুনিক, অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনায় উন্নীত করতে হবে। মূল্যবোধের সংস্কার ও মানবতায় উন্নয়ন শুধু কথার কথা নয়, তাকে প্রতিটি পদে আত্মস্থ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন সেই আদর্শ যথাসম্ভব সরত্নে রক্ষা করেছেন।

আরও পড়ুন-আজ বাইশে শ্রাবণ: প্রয়াণ বার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অবাক করা 7টি অজানা তথ্য

এই যুগে আবার আমরা নতুন করে প্রাণহীন আচার সর্বস্বতার শেকল গলায় পড়ছি। সব সৃষ্টির মূলে যে কারণ তার প্রতি কোন আস্থা, আবেগ ও বিশ্বাস না রেখে ধূপের ধোঁয়া আর মন্ত্রোচ্চারণের কাড়ানাকাড়ায় উপলক্ষ লক্ষ্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে। মসজিদে, মন্দিরে সর্বত্র সেই কোলাহলে ঈশ্বরের দেখা পাওয়া যায় না। যে স্তব্ধ ধ্যানে ঐশ্বরিক সুখ লাভ করা যায়,তা তিনি জীবনযাপনে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। অথচ, কি অম্লান দৃপ্ততায় তিনি সব মানুষের জন্য কল্যাণ, করুণা, দয়া আর ভালবাসার মহৎ চিত্রকথা রচনা করে গেছেন।
বাঙালিত্ব, ভারতীয়ত্ব থেকে মানবতায় উত্তরণে তাই তার পথকে অনুসরণ করতে চাই।
“(সে)বাঁশিতে শিখেছি যে সুর
তাহারি উল্লাসে যদি গীতশূন্য অবসাদপুর
ধ্বনিয়া তুলিতে পারি, মৃত্যুঞ্জয়ী আশার সংগীতে
কর্মহীন জীবনের এক প্রান্ত পারি তরঙ্গিতে
শুধু মুহূর্তের তরে, দুঃখ যদি পায় তার ভাষা,
সুপ্তি হতে জেগে ওঠে অন্তরের গভীর পিপাসা
স্বর্গের অমৃত লাগি– তব ধন্য হবে মোর গান,
শত শত অসন্তোষ মহাগীতে লভিবে নির্বাণ”
(এবার ফিরাও মোরে)।।

আরও পড়ুন-মূর্তি উন্মোচন করে করুনানিধিকে শ্রদ্ধা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের